ভারতীয় সিনেমার অসামান্য অভিনয় শিল্পী নানা পাটেকার;
ভারতীয় সিনেমার অসামান্য অভিনয় শিল্পী নানা পাটেকার;
বাস্তব জীবনেও অনন্য।
সাংবাদিক সোমনাথ খাঁ-এর বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য..✍🏼
ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রতিভাবান, স্পষ্টবাদী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল, অন্তরস্পর্শী এক অভিনেতার নাম "নানা পাটেকার"; যাঁর আসল নাম, বিশ্বনাথ পাটেকার।
সংলাপ প্রকাশের নিখুঁত সময়জ্ঞান, পর্দায় স্বভাবজাত তীব্রতা এবং সংলাপ না বলে কেবল নীরবতা দিয়ে চরিত্রের গভীর আবেগ ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতায় তিনি এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।
খলনায়ক, কঠোর পুলিশ অফিসার, কমেডি কিংবা অত্যন্ত সংবেদনশীল; যেকোনো চরিত্রেই নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাস্তবধর্মী চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারাই তাঁর অভিনয় বৈশিষ্ট্য।
তাঁর অভিনয়ে সমৃদ্ধ বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও সংলাপ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে।
১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ চলচ্চিত্রে গ্যাংস্টার ‘অ্যানা’ চরিত্রে ভয়াল অভিনয় তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
১৯৯৩ সালের ‘তিরঙ্গা’ সিনেমায় রাজ কুমারের পাশাপাশি “নানা কা উসুল হায়..”, “ইয়ে তিলক রাজ কা উসুল হায়” সংলাপের দ্বন্দ্বে বাজিমাত করেছিলেন তিনি।
১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ সিনেমায় “এক মচ্ছর আদমি কো হিজড়া বানা দেতা হায়!”
কিংবা “ইয়ে হিন্দু কা খুন হায়, ইয়ে মুসলমান কা খুন হায়.. বাতা ইসমে হিন্দু কা কৌনসা, মুসলমান কা কৌনসা?”
সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এই কালজয়ী সংলাপগুলো আজও দর্শকের মুখে মুখে ফেরে।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’ সিনেমায় ‘উদয় শেঠ’ চরিত্রে “কন্ট্রোল মজনু, কন্ট্রোল!”
কিংবা “ভগবান কা দিয়া সব কুছ হায়.. দৌলত হায়, শোহরত হায়, ইজ্জত হায়” সংলাপে অনবদ্য কমেডি টাইমিং প্রদর্শন করে তিনি সব বয়সের দর্শকের মন জয় করেন।
এছাড়া ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অপহরণ’, ‘রাজনীতি’, ‘নটসম্রাট’ এবং
সাম্প্রতিক সময়ে বিবেক অগ্নিহোত্রীর ‘দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার’ (২০২৩)-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর বাস্তবধর্মী চরিত্রায়ন ভারতীয় অভিনয়শৈলীর এক অনন্য মানদণ্ড তৈরি করেছে।
অভিনয় জীবনের এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার নানান সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন-
•জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা পার্শ্ব অভিনেতা): 'পরিন্দা' (১৯৮৯)।
•জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা অভিনেতা): 'ক্রান্তিবীর' (১৯৯৪)।
•জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা পার্শ্ব অভিনেতা): 'অগ্নিসাক্ষী' (১৯৯৬)।
•পদ্মশ্রী সম্মান: ভারত সরকার কর্তৃক অসামরিক সম্মান (২০১৩)।
•একাধিক ফিল্মফেয়ার ও রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের এক অপূর্ব ত্রিধারা মিলন ঘটেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে। অভিনয় জগত ছাড়িয়ে তাঁর জীবনসংগ্রাম এবং জীবনবোধ তাঁকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে সিনেমার পোস্টার এঁকে এবং সামান্য উপার্জনে সংসার চালানো নানা পাটেকার কোনোদিন নিজের অতীত ও সাধারণ মানুষের কষ্ট ভোলেননি।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ জাতীয় স্তরের রাইফেল শুটার এবং অসাধারণ রাঁধুনি।
১৯৯০-এর দশকে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর টেরিটোরিয়াল আর্মিতে (মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি) যোগ দেন এবং ক্যাপ্টেন পদমর্যাদা লাভ করেন।
১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় তিনি সরাসরি ফ্রন্টলাইনে গিয়ে সেনাসদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান এবং তাঁদের মনোবল বাড়াতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনের মহৎকর্ম ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অনন্য মর্যাদায় বসিয়েছে।
বিপুল খ্যাতির মালিক হওয়া সত্ত্বেও কোনোপ্রকার বিলাসিতা বা ভিআইপি সংস্কৃতির থেকে তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।
মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের সাহায্যার্থে ২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সাথে যৌথভাবে তিনি গড়ে তোলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (Naam Foundation)।
নিজে গ্রামে ঘুরে ঘুরে খরাগ্রস্ত ও আত্মহত্যাকারী কৃষকদের পরিবার পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা এবং পানীয় জলের সংকট মেটাতে নিরলস কাজ করে গেছেন।
১ জানুয়ারি ১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের মুড়ুদ-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করা এই মহান শিল্পীর শিল্পকর্ম ও মানবসেবা ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তাঁর কালজয়ী অভিনয় ও সমাজসেবামূলক বার্তা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
৮ই অক্টোবর ২০২৬ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর আকষ্মিক প্রস্থান বড়ই মর্মান্তিক।
আমরা এই মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি।
সাংবাদিক সোমনাথ খাঁ-এর বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য..✍🏼
